সুশান্ত কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, আলীকদম;

টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা কার্যত দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদে পরিণত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন উপজেলার হাজারো বাসিন্দা। জরুরি প্রয়োজনে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, “বিদ্যুৎ গেলেই নেটওয়ার্কও উধাও।” দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেছে। ফলে যোগাযোগ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

আলীকদম বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টানা ভারী বর্ষণ ও দমকা হাওয়ার কারণে ১১ কেভি বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের বিভিন্ন স্থানে একাধিক কারিগরি ত্রুটি (ফল্ট) দেখা দিয়েছে। বারবার লাইন ট্রিপ করায় স্বাভাবিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে উপজেলার ১ নম্বর আলীকদম সদর ও ২ নম্বর চৈক্ষ্যং ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ৩ নম্বর নয়াপাড়া ইউনিয়নের কিছু এলাকায় মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ এলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না। অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা গেলেও পুনরায় লাইনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

আলীকদম বিদ্যুৎ বিভাগের লাইনম্যান বুলবুল বলেন, “প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ লাইনের ওপর গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। এতে ১১ কেভি লাইনের একাধিক স্থানে ফল্ট সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো মেরামতের কাজ অব্যাহত রয়েছে।”

এদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে মোবাইল নেটওয়ার্কেও। বিদ্যুৎ না থাকায় অধিকাংশ মোবাইল টাওয়ারের ব্যাকআপ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক এলাকায় কোনো মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কই পাওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, রবির টাওয়ারে জেনারেটর থাকার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ চলে গেলে নেটওয়ার্কও বন্ধ হয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক সচল রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনজুর আলম বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট পরিস্থিতি উপজেলা প্রশাসন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে ১১ কেভি লাইনের একাধিক স্থানে ত্রুটির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। একই সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার বিষয়ে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ অঞ্চলের রবি নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা টাওয়ারে ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছেন।”

তবে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, নিয়মিত বিদ্যুৎ লাইনের পাশের গাছের ডালপালা ছাঁটাই করা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এত বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না। তারা বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে লামা বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

পাহাড়ি এ জনপদের বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িক মেরামত নয়, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাকে দুর্যোগ-সহনশীল করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে আশঙ্কা তাদের।